মার্কিন বাজারে প্রতিকূলতায় ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি শিল্প

0
6

স্টিভ ব্যানন এশিয়ার প্রতি উদার কিংবা এর ভক্ততো নয়ই; উপরন্তু এশিয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই একপ্রকার চটে যান। ফিরে যাই ২০১৫ সালে। ব্যানন তাঁর রেডিও শোতে তখনকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপচারিতায় সত্যকে আড়াল করে বলেছিলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সিলিকন প্রধান নির্বাহী দক্ষিণ এশিয়া অথবা এশিয়ার। এ পরিসংখ্যান যে মোটেও ঠিক নয়, তখনই তা বোঝা মোটেও কষ্টের ব্যাপার ছিল না। আসল তথ্য সম্ভবত এমন ছিল যে, সারাবিশ্বের প্রতি আটজনের একজন সিলিকন প্রধান নির্বাহীর উত্স শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়া। সেই ব্যানন আজ পৃথিবীর সবচে’ শক্তিধর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির প্রধান কৌশলী। ধরতে গেলে তিনিই ঠিক করে দেন, ট্রাম্পকে কখন কী করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রারম্ভিক দিনগুলোতে ব্যাননের বিশ্বায়ন অভিমুখী বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তু ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পগুলো। বিশেষত আমেরিকান আইটি কোম্পানিগুলোর চীনা প্রতিযোগীদের কাছে হুমকির মুখে পড়াটা মোটেও মেনে নিতে পারছেন না এবং সংরক্ষণবাদের যুদ্ধে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান যে সবাইকে সমান সুযোগ দেয়ার পক্ষে নয়, তা এরই মধ্যে বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে। যার শুরুটা হয়েছে মার্কিন ভিসা পাওয়ার নীতি কঠোরতর করার মাধ্যমে। আর যেসব ভারতীয় সফ্টওয়্যার প্রকৌশলী যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন, তাদেরকে নাজেহাল করা শুরু হয়ে গেছে কারণে-অকারণে। এতে শুরু হয়ে যেতে পারে বিশ্বায়ন-বিরোধী তত্পরতা। সেইসাথে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরবরাহ চেইন, যার ওপর নির্ভর করে অনেক বৈশ্বিক কোম্পানি। নিউ হোয়াইট হাউজ ন্যাশনাল ট্রেড কাউন্সিলের প্রধান পিটার নাভারো এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। তার ভাষায়, সরবরাহ ভেঙে দেওয়াটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট নীতি বলে মনে হচ্ছে। এমন প্রচেষ্টার প্রাথমিক আলোকপাত হবে আমেরিকার ঐ-১ই ভিসা ব্যবস্থার ওপর। এর মাধ্যমে প্রতিবছর ৬৫ হাজার উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন বিদেশিকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়, যার সময়সীমা থাকে একবারে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর।

ভারতে আইটি সার্ভিসের আউটসোর্সিং এক বিশাল ব্যবসা, যা থেকে বার্ষিক রাজস্ব আয় হয় আনুমানিক ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে নিঃসন্দেহে এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারের সময় এইচ-ওয়ানবি রুটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সস্তা শ্রমিক কিনে আনার বিষয়টির ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রতিনিধি রিপাবলিকান জো লোফগ্রেন সিনেটে এক বিল উত্থাপন করে ভাবনায় ফেলে দেন ইনফোসিস ও উইপ্রো’র মতো ভারতীয় আইটি গ্রুপকে। লোফগ্রেনের প্রস্তাবনায় এইচ-ওয়ানবি আবেদনকারীদের ন্যূনতম বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে এক লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার করার প্রস্তাব দেন, যা কিনা জ্যেষ্ঠ ভারতীয় নির্বাহীরাই কেবল প্রত্যাশা করতে পারে। তিনি দাবি করেন, এমন হলে আমেরিকায় চাকরির সৃষ্টি হবে, প্রতিস্থাপন হবে না। লোফগ্রেনের বিলটি আইনে পরিণত হবার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, কিন্তু হয়ে গেলে ভারতীয় সফ্টওয়্যার ব্যবসায়ীরা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হবেন যত দ্রুত সম্ভব ট্রাম্পের উদ্যোগ বাস্তবায়নের ভয়ে।

লোফগ্রেনের বিল পাস হলে নয়াদিল্লøীর চিন্তায় পড়াটাই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এতে করে ভারতীয় সফ্টওয়্যার হাউজগুলোর শুধু অনেক খরচই বাড়বে না, আরো অনেক সমস্যার জন্ম দেবে। ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান যেটি ঠিকই আন্দাজ করতে পারছেন, ‘বৃহত্তর দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ওই বিধিনিষেধগুলো সকল প্রকার আউটসোর্সিংয়ের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তা সে ব্যাক অফিস সাপোর্ট থেকে শুরু করে গবেষণা, উন্নয়ন ও আর্থিক সেবায় পর্যন্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ বিশ্বায়ন-বিরোধী কোনো উদ্যোগ নিতে চাইলে তার আগে অসংখ্যবার ভাবতে হবে। সীমাবদ্ধতা সৃষ্টির মানে হচ্ছে সেবা রপ্তানির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং এটি অনেক খারাপ খবর’।

এইচ-ওয়ানবি ভিসার পরিবর্তন ওসব চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে এই ভেবে যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখনই বিশ্বায়ন-বিরোধী ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। ইনফোসিসের মতো ভারতীয় আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো এইচ-ওয়ানবি পদ্ধতি ব্যবহার করে অ্যাপল ও ওয়ালমার্টের মতো গ্রাহক পাওয়ার পাশাপাশি আইটি প্রকৌশলী আনয়ন করে। অ্যাপল ও ওয়ালমার্ট ভারতে আইটি কোম্পানি স্থাপন ও জটিল আইটি পদ্ধতি পরিচালনায় সাহায্য করে।